ভোক্তাব্যয় কমে যাওয়ায় চীনের সামগ্রিক অর্থনীতি প্রভাবিত হচ্ছে। রিয়েল এস্টেট খাতে বড় ধরনের পতনের পর দেশটিতে ভোক্তাব্যয় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না বাড়ার একাধিক কারণ রয়েছে। এর উল্লেখযোগ্য হলো সাধারণত সরকারিভাবে পাওয়া যায় এমন পরিষেবার ক্ষেত্রে চীনে নাগরিকদের বেশি খরচ করতে হয়। এছাড়া অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা অন্য দেশের তুলনায় কম, যা সামগ্রিকভাবে অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমিয়ে দিচ্ছে। যদিও এরই মধ্যে ভোক্তা নিরাপত্তা বাড়ানোর কিছু উদ্যোগ নিয়েছে বেইজিং। কিন্তু নাগরিকদের জন্য দেশটির সরকারের সামাজিক বিনিয়োগ সমপর্যায়ের প্রতিদ্বন্দ্বী বা বেশি আয়ের দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম বলে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
আগামী মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া পার্লামেন্টের বার্ষিক সভায় চীনের নেতারা নতুন অর্থনৈতিক লক্ষ্য ঘোষণা করবেন। জানা গেছে, এতে স্থান পাচ্ছে দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা কাটিয়ে উঠতে প্রণোদনা পদক্ষেপের বিস্তারিত পরিকল্পনা।
বিশ্বব্যাংকের সংকলিত তথ্যানুসারে, স্বাস্থ্যসেবা থেকে সামাজিক নিরাপত্তার মতো সরাসরি নাগরিক পরিষেবায় জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ খরচ করে চীন। অন্যদিকে ইন্ডিভিজুয়াল কনজাম্পশন বা ব্যক্তি পর্যায়ের ভোগের এসব পরিষেবা বাবদ পরিবারগুলো আয়ের ৩৮ শতাংশ খরচ করে। এর অর্থ হলো চীন সরকার সামাজিক কল্যাণে খুব বেশি বিনিয়োগ করছে না, যা দেশের ভোক্তাব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যকলাপের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে চীন একটি উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ। কিন্তু ব্রিকস গ্রুপের ব্রাজিল ও রাশিয়াসহ বেশির ভাগ সদস্য দেশের তুলনায় ব্যক্তি পর্যায়ে ভোগ বৃদ্ধিতে বিনিয়োগে পিছিয়ে রয়েছে বেইজিং। এমনকি অন্যান্য উন্নয়নশীল ও উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায়ও কম।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান মরগান স্ট্যানলির চীনবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ রবিন জিংয়ের মতে, এফটির বিশ্লেষণ সামাজিক পরিষেবায় চীন সরকারের খরচ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। এতে বড় ধরনের সংস্কার না এলে মানুষ ভবিষ্যতের কথা ভেবে আয়ের অর্থ খরচ না করে সঞ্চয় করবে।
অর্থনীতিবিদরা আশা করছেন, বেইজিং আগামী মাসে কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট ঘাটতি ৩ থেকে ৪ শতাংশে বাড়িয়ে দেবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে অতিরিক্ত সরকারি বন্ড ইস্যুর ঘোষণা করবে।
গত সপ্তাহে চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং বলেছেন, অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে অর্থনীতিতে ‘প্রধান ভূমিকা’ রাখতে হবে। বাস্তবেও দেখা যাচ্ছে, গত কয়েক বছরে দেশটি ভোক্তাব্যয় বাড়ানোর জন্য প্রণোদনা পদক্ষেপ চালু করেছে। চীন গত কয়েক দশকে দ্রুত সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করেছে। গ্রামীণ অঞ্চলে পেনশনের বিস্তার এবং ১৪০ কোটি জনগণের অধিকাংশকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় এনেছে। তবে গ্রামীণ অঞ্চলে পেনশন ও স্বাস্থ্য বীমায় অর্থের অংক কম।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকার যদি অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে অতিরিক্ত খরচ করে, তাহলে সেটি সরাসরি পরিবারগুলোর খরচ বাড়ানোর দিকে হওয়া উচিত। চীন সরকার ঐতিহ্যগতভাবে অবকাঠামো বিনিয়োগে বেশি গুরুত্ব দেয়। এ ধরনের বিনিয়োগের তুলনায় পারিবারিক খরচে বিনিয়োগ করলে আরো দ্রুত ও কার্যকর ফল পাওয়া যাবে।
২০২১ সালের তুলনামূলক পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ ভারত ব্যক্তি পর্যায়ের ভোগে জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ খরচ করেছে। যেখানে দেশটির মাথাপিছু আয় চীনের এক-পঞ্চমাংশ। অন্যদিকে অর্থনৈতিক অবস্থা ভিন্ন হলেও চীনের প্রায় সমানই খরচ করে যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ দেশগুলোয় ভোক্তাব্যয় অনেক বেশি। কারণ তারা চীনের তুলনায় ব্যক্তি পর্যায়ে ভোগে উচ্চস্তর অর্জন করতে পেরেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চীনের সঙ্গে দেশগুলোর পার্থক্যের কারণ কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক। যেমন যুক্তরাষ্ট্রে উন্নত সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে বেসরকারি খাতগুলোর অংশগ্রহণ অনেক শক্তিশালী। এটি খরচ বাড়াতে ভোক্তাদের বেশি আত্মবিশ্বাস দিয়ে থাকে।
ভোক্তা আত্মবিশ্বাসের দিক থেকে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে তুলনা করেন আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইএনজির গ্রেটার চীনবিষয়ক প্রধান অর্থনীতিবিদ লিন সং। তার মতে, চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে পেনশন সুবিধা বেশি হওয়ায় একজন মার্কিনের জন্য খরচ করা বেশি আরামদায়ক। লিন সং বলেন, ‘অবসরকালে চীনে বেশির ভাগ মানুষকে সঞ্চয়ের অর্থ ব্যবহার করতে হয়। চীনা পরিবারগুলোয় এ ধরনের সতর্কতা প্রজন্মগতভাবে দেখা যায়।’
অন্যদিকে মার্কিন ভোক্তারা চীনাদের তুলনায় ঋণ নিতে বেশি ইচ্ছুক, যা তাদের ব্যক্তিগত খরচ বাড়ায়। সম্পদ ব্যবস্থাপনা সংস্থা নাটিকসের এশিয়া প্যাসিফিক বিভাগের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হারেরো বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে উন্নত বীমা বাজার রয়েছে, যা গৃহস্থালি পর্যায়ে অপ্রত্যাশিত বিপর্যয়ের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। চীনে জীবনবীমা উন্নত হলেও অন্যান্য ধরনের বীমা ততটা প্রচলিত নয়।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বেইজিংভিত্তিক সিনিয়র ফেলো মাইকেল পেটিস বলেছেন, চীনে ভোক্তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর সেরা উপায় হবে বিদ্যমান অবসরপ্রাপ্তদের পেনশনে বড় ও তাৎক্ষণিক বিনিয়োগ। চীনের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনাকে এখন আরো অর্থ খরচ করতে হবে। তাই সব অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের পেনশন দ্বিগুণ করুন—এটি খরচে প্রতিফলিত হবে।’